অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ : Aug 4, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা কেন রিডিংয়ে পিছিয়ে?

বাংলা ও ইংরেজি রিডিং দক্ষতা শিক্ষার মৌলিক ভিত্তি। একজন শিক্ষার্থী যদি সাবলীলভাবে পড়তে না পারে, তাহলে পরবর্তী শ্রেণিতে গিয়ে অন্যান্য বিষয়ও তার কাছে কঠিন হয়ে ওঠে। বাস্তবে দেখা যায়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী নির্ধারিত শ্রেণিতে উন্নীত হলেও রিডিং দক্ষতায় প্রত্যাশিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারে না।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রশ্ন আলোচিত হচ্ছে—কেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী বাংলা ও ইংরেজি রিডিংয়ে কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের তুলনায় পিছিয়ে থাকে? সাধারণভাবে এ জন্য শিক্ষককে দায়ী করা হয়। অনেকের ধারণা, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অদক্ষ, অযোগ্য কিংবা দায়িত্ব পালনে উদাসীন বলেই শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। কিন্তু বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, বিষয়টি এতটা সরল নয়।

বাংলা ও ইংরেজি রিডিংয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে থাকার পেছনে শুধু শিক্ষক নন, আরও নানা বাস্তব কারণ একযোগে কাজ করে। যেমন—

১. পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী বাড়িতে পড়াশোনার জন্য অনুকূল পরিবেশ পায় না। অভিভাবকদের একটি বড় অংশ নিয়মিত পড়াশোনার তদারকি করতে পারেন না। অনেক শিক্ষার্থী গৃহশিক্ষক কিংবা অতিরিক্ত অনুশীলনের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়।

অন্যদিকে, কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে বেশি পারিবারিক সহযোগিতা ও নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগ পায়।

২. শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাত

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনেক ক্ষেত্রে একজন শিক্ষককে ৫০ থেকে ৭০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে পাঠদান করতে হয়। ফলে প্রতিটি শিশুর রিডিং দক্ষতা আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয়ে সাধারণত ১৫ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থী থাকায় প্রত্যেকের প্রতি ব্যক্তিগতভাবে নজর দেওয়া সহজ হয়।

৩. শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পাঠদানের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি জরিপ, প্রশিক্ষণ, তথ্য সংগ্রহ, উপবৃত্তি কার্যক্রমসহ নানা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। এসব অতিরিক্ত কাজের কারণে শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি সময় দেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়।

অন্যদিকে, কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রধান দায়িত্বই থাকে পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি মূল্যায়ন।

৪. সময়সূচির প্রভাব

অধিকাংশ কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয়ে ক্লাস অনুষ্ঠিত হয় সকালে, যা শিশুদের শেখার জন্য তুলনামূলকভাবে উপযোগী সময়।

অন্যদিকে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনেক ক্ষেত্রে ক্লাস শুরু হয় দুপুরে এবং চলে বিকেল পর্যন্ত। দুপুরের গরম, খাবারের পর ক্লান্তি এবং মনোযোগ কমে যাওয়ার কারণে শেখার কার্যকারিতা হ্রাস পায়। বাংলা ও ইংরেজি রিডিংয়ের মতো মনোযোগনির্ভর দক্ষতা অর্জনে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়।

৫. নিয়মিত অনুশীলনের অভাব

রিডিং দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রতিদিন নিয়মিত চর্চা অপরিহার্য। কিন্তু অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের বাইরে নিয়মিত পড়ার সুযোগ পায় না। ফলে শ্রেণিকক্ষে শেখা বিষয়গুলো ধীরে ধীরে ভুলে যায়।

৬. শিক্ষার্থী উপস্থিতি ও শেখার ধারাবাহিকতা

অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকে না। অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে শেখার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়, যা রিডিং দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে কাজ করে।

তাহলে কি শুধুই শিক্ষক দায়ী?

না। শিক্ষকের দক্ষতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের রিডিং দুর্বলতার জন্য শুধু শিক্ষককে দায়ী করা বাস্তবসম্মত নয়।

বাস্তবতা হলো—

  • পরিবার,
  • সামাজিক পরিবেশ,
  • শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাত,
  • প্রশাসনিক চাপ,
  • নিয়মিত অনুশীলনের অভাব,
  • এবং বিশেষ করে বিদ্যালয়ের সময়সূচি—

সবকিছু মিলিয়েই একজন শিক্ষার্থীর শেখার ফলাফল নির্ধারিত হয়।

করণীয়

  • প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাবান্ধব সময়সূচি নিশ্চিত করা।
  • সম্ভব হলে সকালভিত্তিক পাঠদান সম্প্রসারণ করা।
  • শিক্ষকদের দাপ্তরিক কাজ কমানো।
  • শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী সংখ্যা যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসা।
  • বিদ্যালয় ও অভিভাবকদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় বৃদ্ধি করা।
  • প্রতিদিন বাধ্যতামূলক রিডিং চর্চার ব্যবস্থা করা।
  • দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা কার্যক্রম চালু করা।

পরিশেষে

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে পড়ার কারণ কোনো একক বিষয় নয়। এটি পুরো শিক্ষা-পরিবেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সমন্বিত বাস্তবতা। তাই সমস্যার স্থায়ী সমাধানও হতে হবে বাস্তবভিত্তিক, সমন্বিত এবং শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

যুক্তরাষ্ট্রে টিকটকে ঢুকলে দেখা যাচ্ছে নতুন বার্তা

1

তেঁতুলিয়ায় জনসেবায় আলোচনায় চেয়ারম্যান প্রার্থী দুলাল হোসেন (

2

বিচারকদের আবাসনে ৭২ ভবনের মাস্টারপ্ল্যান

3

ব্রাজিলের সামনে ‘হেক্সা’ সমীকরণ: গৌরবের শিরোপা নাকি হতাশার র

4

ফুলবাড়ী কয়লাখনি নিয়ে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’

5

কাজ শেষে ১২.৫৫ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত, প্রশংসায় ইউএনও

6

জিয়া ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে মির্জা আব্বাসের শ্রদ্ধা

7

বিএনপি নেতা জহুরুল ইসলাম বাবুর মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক

8

পীরগঞ্জে আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত

9

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিকে খেলাফত মজলিসের শুভেচ্ছা

10

পীরগঞ্জে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অংশগ্রহণে বাডাস মেডিকেল ক্যাম্প

11

ঘর থেকে সংসদ: নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় পাঁচ দফা দাবি

12

মুক্তমত প্রকাশ–সংক্রান্ত ও গায়েবি মামলা ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্

13

শুধু মফিজুল হকই কেন, জবাবদিহি হবে সবার?

14

তেঁতুলিয়ায় তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেও তথ্য না পাওয়ার অভিযো

15

ঢাবি সিনেট নির্বাচন: বিএনপির সমন্বয় কমিটি

16

‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত: মির্জা

17

সরকারের ব্যর্থতায় দেশ আতঙ্কের জনপদ: সিপিবি সভাপতি

18

বুড়াবুড়ি আদর্শ কিন্ডারগার্টেনে কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা

19

পুলিসিক ছাড়াই দাপুটে যুক্তরাষ্ট্র, প্রথমার্ধেই অস্ট্রেলিয়াকে

20