নেপাল এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ। বৈশ্বিক নিঃসরণ-সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণে নেপালের অংশ ০.১ শতাংশেরও কম। অথচ ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশটি দুর্যোগের অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যা দেখিয়েছে, চরম আবহাওয়া কত দ্রুত একটি জনপদকে মানবিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। ধ্বংস হয়েছে ঘরবাড়ি, অবকাঠামো ও মানুষের জীবিকার পথ।
নেপালের ভৌগোলিক বাস্তবতা এই সংকটকে আরও গভীরভাবে বোঝার সুযোগ দেয়। বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতমালা হিমালয়ের বড় একটি অংশ এই দেশজুড়ে বিস্তৃত। বিপুল বরফ ও মিঠা পানির মজুদের কারণে হিমালয় অঞ্চলকে অনেক সময় ‘তৃতীয় মেরু’ বা Third Pole বলা হয়। কিন্তু বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে নেপালের হিমবাহগুলো গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বরফ হারিয়েছে। এর প্রভাব শুধু পাহাড়ি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়; পানি নিরাপত্তা, কৃষি এবং হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলোর ওপর নির্ভরশীল বিপুল জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
হিমবাহ দ্রুত গলে গেলে পানির প্রবাহ বাড়তে পারে এবং তৈরি হতে পারে বিপজ্জনক হিমবাহ-হ্রদ। এসব হ্রদ কোনো কারণে অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে নিচের দিকে হঠাৎ ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হতে পারে। আবার দীর্ঘমেয়াদে হিমবাহের বরফ কমে গেলে পানির প্রাপ্যতাও সংকটে পড়তে পারে। অর্থাৎ পাহাড়ের ওপরের পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত বহু দূরের মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
সাম্প্রতিক বন্যায় মানুষের দুর্ভোগ ও প্রাণহানির চিত্রও গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, বিপজ্জনক পানিতে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে কাজ করছেন উদ্ধারকর্মীরা। কোথাও পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়েছে, কোথাও ঘরবাড়ি হারিয়েছে মানুষ, আবার কোথাও পুরো জনপদকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ে নামতে হয়েছে। এই দুর্যোগ মানুষের সম্পদ নষ্ট করার পাশাপাশি তাদের জীবিকা ও নিরাপত্তার অনুভূতিকেও মারাত্মকভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।
আঙ্কারাভিত্তিক গণমাধ্যম Anadolu Agency-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত নেপাল ও চীনে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৩২৫ জনে পৌঁছেছে। উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এখনো প্রায় ৫ হাজার ৬১৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের মধ্যে ৮৪৪ জন বিদেশি নাগরিক। দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী এখন পর্যন্ত ১১ হাজার ৯৯৩ জনকে উদ্ধার করেছে। এছাড়া প্রায় ২২ হাজার শিশু নিরাপদ পানির সংকট, খাদ্যাভাব ও অক্সিজেনের ঘাটতির মধ্যে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিটি সংখ্যা আসলে একটি করে মানুষের জীবন, একটি পরিবার এবং একটি বিপর্যস্ত ভবিষ্যতের গল্প বহন করছে।
এখানেই জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় অবিচারটি স্পষ্ট হয়—যারা এই সংকট তৈরিতে সবচেয়ে কম ভূমিকা রেখেছে, তারাই অনেক সময় সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতির শিকার হয়। কয়েক দশক ধরে শিল্পোন্নত দেশগুলো বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বড় ভূমিকা রেখে এসেছে। UNEP Emissions Gap Report 2025 অনুযায়ী, বিশ্বের ২০টি বৃহৎ অর্থনীতির জোট G20 ২০২৪ সালে বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ৭৭ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল। বিপরীতে নেপাল ও বাংলাদেশের মতো তুলনামূলক কম নিঃসরণকারী দেশগুলো জলবায়ুজনিত নানা দুর্যোগের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
এ বাস্তবতা একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে—যে সংকট তৈরিতে কয়েকটি দেশ ঐতিহাসিকভাবে বেশি ভূমিকা রেখেছে, সেই সংকটের ক্ষতির বোঝা সবাই সমানভাবে বহন করবে কেন? ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পুনরুদ্ধারের ব্যয় কে বহন করবে?
জলবায়ু পরিবর্তন তাই কেবল পরিবেশের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ন্যায়বিচার, দারিদ্র্য, উন্নয়ন, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক দায়িত্বের প্রশ্ন। নেপালের সাম্প্রতিক বন্যার মতো দুর্যোগ কয়েক দশকের উন্নয়ন-অর্জনকে অল্প সময়ের মধ্যেই ধ্বংস করে দিতে পারে। সড়ক, সেতু, বিদ্যালয়, ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হারিয়ে গেলে একটি অঞ্চলের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘ সময় ও বিপুল অর্থ প্রয়োজন হয়।
বিশেষ করে দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি থাকা পরিবারের জন্য একটি ঘর কিংবা জীবিকার উৎস হারানো মানে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা। দুর্যোগের প্রভাব শুধু ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাতেই আটকে থাকে না। যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, খাদ্য সরবরাহ এবং কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়। পুনর্গঠনের বাড়তি ব্যয় মেটাতে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ খাত থেকেও অর্থ সরিয়ে নিতে হতে পারে।
এই কারণেই জলবায়ু দুর্যোগ কোনো সীমান্ত মানে না। বায়ুমণ্ডল কোনো রাজনৈতিক সীমানা অনুসরণ করে না। একটি দেশে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক বায়ুমণ্ডলের অংশ হয়ে যায় এবং এর উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে। তাই প্রতিটি দেশের নিজস্ব সক্ষমতা অনুযায়ী নিঃসরণ কমানোর দায়িত্ব রয়েছে। একই সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে বেশি নিঃসরণকারী দেশগুলোর ওপর ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে সহায়তা করার বিশেষ দায়িত্বও রয়েছে। এখানেই নিহিত জলবায়ু ন্যায়বিচার।
নেপালের মতো দেশগুলোর জন্য জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া বা অভিযোজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শক্তিশালী আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো, উন্নত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত উদ্ধার সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি। কিন্তু শুধু অভিযোজনের মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। বৈশ্বিক তাপমাত্রা যদি ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তাহলে অভিযোজনের সক্ষমতারও একটি সীমা রয়েছে। তাই সংকটের মূল কারণ—গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ—কমানোর জন্য বৈশ্বিক পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
নেপালের অভিজ্ঞতা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, পাকিস্তানসহ এই অঞ্চলের দেশগুলো পরস্পর-সংযুক্ত জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিধস, খরা ও তাপপ্রবাহ—বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগ একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। হিমালয়ের পরিবর্তন নিম্নাঞ্চলের নদী ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে একটি দেশের জলবায়ু সংকট অন্য দেশের মানুষের জীবনেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণে প্রয়োজন আঞ্চলিক সহযোগিতা ও যৌথ উদ্যোগ। দুর্যোগ প্রস্তুতি, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, নদীর পানি ব্যবস্থাপনা এবং তথ্য বিনিময়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা আরও বাড়াতে হবে। পাশাপাশি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সরাসরি আর্থিক সহায়তা, প্রযুক্তি ও কারিগরি সক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জলবায়ু মোকাবিলার কার্যক্রম যেন শুধু বক্তৃতা, সম্মেলন ও ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। বন্যা ও গলতে থাকা হিমবাহের বাস্তবতায় বসবাসকারী মানুষের প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ—নিরাপদ অবকাঠামো, নির্ভরযোগ্য সতর্কবার্তা, সহনশীল জীবিকার সুযোগ, সহজলভ্য অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক সংহতি।
বন্যার পানিতে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার করার দৃশ্য কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ছবি নয়; এটি গোটা বিশ্বের জন্য একটি সতর্ক সংকেত। নেপালের সাম্প্রতিক দুর্যোগের প্রতিটি পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে মানুষ, পরিবার ও জীবনের গল্প। তাদের জীবন-জীবিকা কোনো না কোনোভাবে এই বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নেপালের অভিজ্ঞতা আমাদের জলবায়ু-দায়বদ্ধতার বিষয়টি নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। কোনো দেশের কার্বন নিঃসরণ কম হলেও তার জলবায়ু ঝুঁকি অনেক বেশি হতে পারে। অন্যদিকে, বেশি নিঃসরণকারী G20 দেশগুলোর উচিত ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর পাশে দাঁড়ানো। এভাবেই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে প্রকৃত জলবায়ু ন্যায়বিচার।
জলবায়ু পরিবর্তন বৈশ্বিক, কিন্তু জলবায়ু ঝুঁকি অসম। নেপালের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ওপর নেমে আসা বিপর্যয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে—জলবায়ু সংকট থেকে নিরাপদ থাকার মতো কোনো দূরত্ব নেই। রাজনৈতিক সীমান্ত দেশকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু বায়ুমণ্ডল, মহাসাগর, নদী ও বৈশ্বিক আবহাওয়াব্যবস্থা পৃথিবীর দেশগুলোকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে রেখেছে।
জলবায়ু দুর্যোগ কোনো সীমান্ত মানে না। তাই এসব দুর্যোগ প্রতিরোধ, মোকাবিলা এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে সুরক্ষিত করার দায়িত্বও কোনো সীমান্তে আটকে থাকা উচিত নয়।
এখন সময় এসেছে বিশ্বকে উপলব্ধি করার যে, জলবায়ু ন্যায়বিচার কোনো দয়া বা দান নয়; এটি সবার যৌথ দায়িত্ব। বিশ্বের এক প্রান্তে সৃষ্ট নিঃসরণ যদি অন্য প্রান্তের মানুষের দুর্ভোগের কারণ হতে পারে, তাহলে জলবায়ু মোকাবিলার অর্থায়ন, প্রযুক্তি, সহযোগিতা ও সংহতিকেও সীমান্ত অতিক্রম করতে হবে।
নেপালের বন্যাকে তাই একটি বিচ্ছিন্ন জাতীয় ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি পুরো বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা। পরিবর্তিত জলবায়ুর প্রভাব থেকে কোনো দেশ একা নিরাপদ থাকতে পারবে না। একইভাবে, এর ভয়াবহ পরিণতির মুখে কোনো দেশকেই একা ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
মন্তব্য করুন